Skip to main content

প্রবাসে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ প্রকৃয়া

আজ থেকে ২৫-৩০ বছর আগে আমরা যখন স্কুল পড়তাম তখন একটা কথা শুনতাম– ছোট হয়ে আসছে পৃথিবী। যার অর্থ ছিল পৃথীবীর কোন কিছুই মানুষের ধরা ছোঁয়ার বাইরে নয়, মানুষ ঘরে বসেই জানতে পারছে পৃথিবীর কোথায় কী হচ্ছে। পঁচিশ বছর আগের কথাটা এখন আরো স্পষ্টভাবে আমরা বুঝতে পারি। পৃথিবী আর ছোট হয়ে আসছেনা, পৃথিবী ছোট হয়ে গিয়েছে। আগের চেয়ে অনেক সহজে পৃথিবীর এক প্রান্তের মানুষ প্রতি মুহুর্তে জানতে পারছে অন্য প্রান্তে কী ঘটছে।

তথ্যের সহজলভ্যতা জীবনে এনেছে অসম্ভব গতি। যার সুফল আমরা সমাজের নানা ক্ষেত্রেই দেখতে পাই। এই গতি যেমন মানুষের দৈনন্দিন কার্যক্রমকে বদলে দিয়ছে তেমনই শিক্ষা ক্ষেত্রেও যেন এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।

উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ছাত্রছাত্রীদের ব্যাচেলর্স ও মাস্টাস্ট শেষে উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশে যাওয়া একটি সহজাত প্রত্যাশা। তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়ন আর সেই সাথে তথ্যের সহজলভ্যতা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির সাথে ধারণা করা যায় যে বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রীরা আগের তুলনায় এখন অধিক সংখ্যায় পড়াশুনা করতে বিদেশে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশই পিএইচডি প্রোগ্রামে আসছে এবং ডিগ্রী শেষ করে আবার দেশে ফিরে যাচ্ছে। আবার একটি অংশ এসব দেশেই থেকে যাচ্ছে। যারা থেকে থেকে যাচ্ছেন তাদের বড় একটা অংশ প্রাইভেট ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ পাচ্ছেন আবার অনেকেই পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করছেন। প্রবাসে বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নেন ধারণা করা যায় তাদের অধিকাংশই বাংলাদেশের কোন না কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন।

লেখাটির উদ্দেশ্য

আমার লেখটি মূলত প্রবাসে বিশেষ করে আমেরিকা ও কানাডায় শিক্ষকতা সম্পর্কে আমার যে সামান্য অভিজ্ঞতা হয়েছে তা সবার সাথে শেয়ার করার জন্য। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসব দেশে কিভাবে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয় তা খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। আমি গ্রাজুয়েট-ছাত্র হিসেবে শিক্ষক নিয়োগ কমিটিতে কাজ করেছি আবার শিক্ষক হিসেবেও শিক্ষক নিয়োগ কমিটিতে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। নিশ্চয়ই অবাক হচ্ছেন ছাত্র হিসেবে কিভাবে শিক্ষক নিয়োগ কমিটিতে আমি কাজ করলাম! সেটা একটু পরেই বলছি।

এই লেখার দুটি উদ্দেশ্য রয়েছে। একটি প্রত্যক্ষ, আরেকটি পরোক্ষ। পরোক্ষ উদ্দেশ্যটি হলো আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষালাপের পাঠকমহল আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগ প্রকৃয়াটির সাথে অন্যদের একটা তুলনা করার সুযোগ পাবেন। উন্নত বিশ্বের তুলনায় শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান কোথায়, আমাদের পদ্ধতিতে কোন পরিবর্তন বা পরিবর্ধনের প্রয়োজন আছে কিনা বা অদূর ভবিষ্যতে তার প্রয়োজন হবে কিনা সেটি বিবেচনার ক্ষেত্র প্রস্তুত করবে বলে ধারণা করি।

প্রত্যক্ষ উদ্দেশ্যটি তাদের জন্য যারা বিদেশে মূলত: আমেরিকা এবং কানাডায় পিএইচডি শেষ করে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নিতে চান। এখানে সাফল্যের জন্য শুধু ভালো ফলাফলই যথেষ্ট নয়, সাথে আরো অনেক রকমের প্রস্ততি নিতে হয়। কিভাবে প্রস্ততি নিতে হয় সে সম্পর্কেও পরবর্তী কোন লেখায় আমি একটা ধারনা দেয়ার চেষ্টা করবো। আমেরিকা এবং কানাডায় অর্জিত অভিজ্ঞতার আলোকেই আমার এই লেখা। তবে ধারণা করি অস্ট্রেলিয়া, ইউকে কিংবা উন্নত বিশ্বের অন্যান্য দেশেও ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে।

আমেরিকা-কানাডায় উচ্চশিক্ষা সম্পর্কে ধারণা

শিক্ষক নিয়োগ প্রকৃয়া ব্যাখ্যা করার আগে এদের শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে একটু ধারণা দেয়া প্রয়োজন। আমেরিকা-কানাডায় উচ্চ শিক্ষা প্রতিস্ঠান বলতে হাইস্কুলের পরের ধাপকে বোঝায়। এদের হাইস্কুল আমাদের কলেজ লেভেলের সমান। অর্থাৎ ১২ বছরের পাঠ। আমেরিকায় একজন হাইস্কুল পাশ করলে (এদের বলা হয় হাইস্কুল গ্রাজুয়েট) সেটা আমাদের দেশের কলেজ থেকে বিএ/বিএস-সি/বি-কম পাশের সমতূল্য। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়কে অনেক সময় কলেজ বলে। তাদের ভাষায় এই কলেজ আবার দুই প্রকার–কমিউনিটি কলেজ যারা দুই-বছরের ডিগ্রী প্রদান করে; অন্যটি বিশ্ববিদ্যালয় যারা চার-বছরের ডিগ্রী প্রদান করে।

আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থাৎ যারা চার-বছর মেয়াদি ব্যাচেলর ডিগ্রি দেয় সেসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ প্রকৃয়ার মধ্যে আমার আলোচনা সীমিত রাখবো।

শিক্ষক নিয়োগ প্রকৃয়া

এখানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ একটি বিশ্বব্যাপি প্রকৃয়া। অর্থাৎ দেশের এবং পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের যেকোন নাগরিক যিনি এই পদের জন্য যোগ্য তিনি আবেদন করতে পারেন। যার মানে হলো আপনি বাংলাদেশে বসেও আমেরিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার জন্য আবেদন করতে পারেন।

শিক্ষক নিয়োগ প্রকৃয়াটিকে চারটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমত বিজ্ঞাপন এবং প্রাথমিক আবেদন এবং সেগুলোর যাচাই বাছাই, দ্বিতীয়ত নিয়োগ কমিটি কর্তৃক প্রাথমিক তালিকা প্রস্ততি এবং সম্ভাব্য যোগ্য প্রার্থীদের একটি শর্ট লিষ্ট তৈরী করা, তাদের টেলিফোনে ইন্টারভিউ নেয়া এবং তাদের মধ্যে থেকে তিনজন প্রার্থীকে ক্যাম্পাস ইন্টারভিউয়ের জন্য আহবান করা। চতুর্থত: ক্যাম্পাস ইন্টারভিউ এবং সব শেষে সবচেয়ে যোগ্য বা সুইটেবল প্রার্থীকে চাকুরির অফার দেয়া। প্রতিটি ধাপ সম্পর্কে নিচে বিস্তারিত লিখছি।

বিজ্ঞাপন ও বিজ্ঞাপনের ভাষা

এখানে শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞাপনে পদ অনুযায়ি সর্বনিম্ন যোগ্যতা উল্লেখ করা থাকে। আমেরিকা এবং কানাডায় সাধারণত সহকারি অধ্যাপক পদে নিয়োগ দিয়েই একাডেমিক ক্যারিয়ার শুরু হয়। বাংলাদেশের যেমন প্রথম পদটি প্রভাষকের, এখানে তেমনি প্রথম পদটি সহকারি অধ্যাপকের। যারা পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেছে অথবা অর্জনের পথে (শুধু থিসিস ডিফেন্স বাকী) তারা এসব পদের জন্য বিবেচিত হন। প্রভাষক পদের জন্য যহেতু মাস্টার্স থাকাই যথেষ্ট সেহেতু মাস্টার্স ডিগ্রীধারিরাও প্রভাষক পদের জন্য আবেদন করতে পারেন। এরা স্হায়ী পদকে বলে টেনিউর ট্রাক (Tenure track) যারা মানে হল পদটি স্থায়ী কিন্তু প্রাথমিক নিয়োগ হবে অস্থায়ীভাবে। বাংলাদেশে যেমন স্থায়ী পদের বিপরীতে প্রবেশনারি পদে নিয়োগ দেয়, অনেকটা সেরকম। সহকারি অধ্যাপক পদে নিযুক্ত একজন সাধারণত পাঁচ বছর পরে স্হায়ী পদ লাভের জন্য আবেদন করতে পারেন। চাকুরি স্হায়ী হলে তাদের বলে টেনিউরড (Tenured) প্রফেসর। উল্লেখ্য যে এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষককেই ছাত্ররা এবং সাধারণ মানুষেরা প্রফেসর ডাকে। অর্থাৎ ইউনিভার্সিটি প্রফেসর মানে হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক; প্রফেসর মানেই তিনি যে পুরাদস্তর প্রফেসর (পদবী) তা নাও হতে পারে। এসিসট্যান্ট প্রফেসরকেও বলে প্রফেসর, আবার এসোসিয়েট প্রফেসরকেও বলে প্রফেসর।

ফিরে আসি বিজ্ঞাপনে। শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞাপনে পরিস্কারভাবে লেখা থাকে একজন প্রার্থীর কী কী যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। পুরো বাছাই ও নিয়োগ প্রকৃয়াতে এই বিজ্ঞাপনের শর্তগুলো পুরণ হচ্ছে কিনা সেটা পুংখানুপুংখভাবে অনুসরণ করা হয়। কোন প্রার্থীকে বাছাই থেকে বাদ দিতে হলেও এই বিজ্ঞাপনে উল্লিখিত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার বিবরণকে মাপকাঠি হিসেবে ধরে সেরকম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়ে থাকে।

বিজ্ঞাপনে অনেক সময় সাধারণ যোগ্যতা এবং বিশেষ যোগ্যতার কথা আলাদা আলাদা ভাবে লেখা থাকে। সাধারণ যোগ্যতার মধ্যে থাকে আন্ডারগ্রাড (ব্যাচেলরস) এবং গ্রাজুয়েট লেভেলে (মাস্টার্স/পিএইচডি) পড়ানোর অভিজ্ঞতা এবং আগ্রহ, থিসিস সুপারভাইজ করার অভিজ্ঞতা ও আগ্রহ ইত্যাদি। বিশেষ যোগ্যতার মধ্যে থাকতে পারে বিশেষ কোন সফটওয়্যারে দক্ষতা কিংবা বিশেষ কোন কোর্স পড়ানোর অভিজ্ঞতা, ইত্যাদি। কোন কোন পদে পড়ানোর উপর বেশী জোর দেয়া হয় আবার কোন কোন পদে গবেষণার উপর বেশী জোর দেয়া হয়। আবার অধিকাংশ পদেই পড়ানো এবং গবেষণা উভয়ের উপরই জোর দেয়া হয়। বিজ্ঞাপনে এসব পরিস্কারভাবে লেখা থাকে। যেসব পদে পড়ানোর উপর বেশী জোর দেয়া হয় সেসব প্রার্থীদের অবশ্যই পড়ানোর অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। আর যেসব পদে গবেষণাকে বেশী গুরুত্ব দেয়া হয় সেসব প্রার্থীদের অনুদানপ্রাপ্ত গবেষণা কাজের অভিজ্ঞতা, বিভিন্ন এজেন্সির কাছে গবেষণার জন্য প্রোপোজাল তৈরির ও জমা দেয়ার অভিজ্ঞতাসহ অনুদান পাওয়ার অভিজ্ঞতা থাকতে হয়।

অনেক সময় উইনিভার্সিটির নিজস্ব ওয়েবসাইটে গিয়ে অনলাইনে আবেদন করতে হয়। আবার অনেক সময় আবেদনপত্র ইমেইলে নিয়োগ কমিটির প্রধান বরাবর পাঠাতে হয়। আবেদনের জন্য যা যা লাগে সেগুলো হলো– আবেদনপত্র বা কাভার লেটার, একাডেমিক সিভি, একডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট, পাবলিকেশনের প্রমান হিসেবে দুই/তিনটা পেপারের কপি বা পেপারের প্রথম পাতার কপি, ৩-৫টি রেফারেন্স লেটার, স্টেইটমেন্ট অব টিচিং ফিলোসফি, এবং স্টেইটমেন্ট অব রিসার্চ। আবেদনপত্রে উল্লেখ করতে হয় কেন এই পদের জন্য আপনি আগ্রহী হলেন, কেন আপনি যোগ্য এবং আপনাকে নিয়োগ দিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কী কী লাভ হবে সেসব সুন্দর করে সাজিয়ে লিখতে হয়। আবেদনপত্র সাধারণত এক থেকে দেড় পাতার মধ্যে হতে হয়। তবে এর কোন ধরাবাধা নিয়ম নেই। যেহেতু একটি পদের জন্য কখনো কখনো ৫০ থেকে ৩৫০ পর্যন্ত বা তারও বেশী আবেদন আসে, তখন এই আবেদনপত্র বা কাভার লেটারটি সারাংশ হিসেবে কাজ করে। তাই আমার মতে এটি এক থেকে দেড় পাতার মত হওয়া উচিত যাতে মোটামুটি সবকিছুই গুছিয়ে নিজেকে উপস্থাপন করা যায়।

টেলিফোন ইন্টারভিউ

আবেদন করার পর এইচআর অফিস সেগুলো প্রাথমিক যাচাই বাছাই করে নিয়োগ কমিটির কাছে পাঠায়। নিয়োগ কমিটিতে একজন প্রধান এবং তার সাথে ৪/৫ জন ফ্যাকাল্টি সদস্য, একজন ছাত্র প্রতিনিধি, এবং একজন একুইটি অফিসার থাকেন। এই সেটাপ ইউনিভার্টি থেক ইউনিভার্সটিতে আলাদা হতে পারে। অনেক ইউনিভার্সটির নিয়োগ কমিটিতে ছাত্র প্রতিনিধি থাকে না। একুইটি অফিসারের দায়িত্ব হলো প্রতিটি আবেদনকারিকে সমানভাবে দেখা হচ্ছে কিনা, কাউকে কোন বাড়তি সুবিধা দেয়া হচ্ছে কিনা, বা কাউকে ধর্ম, বর্ণ, জাতীয়তা, সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন ইত্যাদির বিচারে বাদ দেয়া হচ্ছে কিনা।

কমিটির প্রতিটি সদস্য প্রতিটি প্রার্থির আবেদনপত্র যাচাই বাছাই করে। তারপর সবাই একসাথে বসে সবার মতামতের ভিত্তিতে একটি শর্ট লিস্ট তৈরী করা হয়। এই শর্টলিস্ট তৈরী করতে অনেক সময় একটি ফরম ব্যবহার করা হয় যেখানে প্রতিটি প্রার্থীর স্কোর করা হয়। এই স্কোরের ভিত্তিতে সাধারণত ৫-৭ জন প্রার্থীকে প্রাথমিকভাবে বাছাই করা হয়। এরপর তাদেরকে টেলিফোন ইন্টারভিউয়ের জন্য যোগাযোগ করা হয়।

টেলিফোন ইন্টারভিউকে দ্বিতীয় স্তরের বাছাই বলা চলে। একটি সাধারণ প্রশ্নপত্র থাকে যেখানে ৭-১০ টি প্রশ্ন থাকে যা শর্ট লিস্টেড প্রার্থীদের টেলিফোনে জিজ্ঞেস করা হয়। উল্লেখ্য যে নিয়োগ প্রকৃয়ায় ইন্টারভিউগুলো প্রথাগত ভাইভা পরীক্ষার মতো নয়। এখানে ইন্টারউভিউতে একজন প্রার্থীকে সাবজেক্ট সম্পর্কে তার জ্ঞান পরীক্ষা করা হয়না। প্রশ্নগুলো অন্যরকম হয় যার দ্বারা প্রার্থী পদটির জন্য কতটা যোগ্য বা ফিট, ডিপার্টমেন্ট এবং ইউনিভার্সিটি তার কাছে থেকে কতটা পেতে পারে, তাকে নিলে ডিপার্টমেন্টের প্রয়োজন মিটবে কিনা এসব জানার চেষ্টা করা হয়। অনেক সময় প্রার্থী কাগজে কলমে অনেক শক্ত হয়ে থাকে কিন্তু টেলিফোন ইন্টারইভিউতে দেখা যায় তার কমিউনিকেশন স্কিল ততটা ভাল না কিংবা দেখা গেল বিশেষ একটি যোগ্যতা–যেটি পদটির জন্য থাকতেই হবে প্রার্থীর সেটি নেই, কিংবা সেটিতে প্রার্থী ততটা আগ্রহী নন বা গ্রহণযোগ্যভাবে সেটিকে উপস্থাপন করতে পারলেন না।

সকল প্রার্থীকেই একই প্রশ্ন করা হয় এবং সেই উত্তরগুলোকে অডিওতে রেকর্ড করা হয় কিংবা কাগজে লিখে ফেলা হয়। সবার ইন্টারভিউ নেয়া হয়ে গেলে পরবর্তীতে নিয়োগ কমিটি মিটিংএ বসে তিনজন প্রার্থীকে ফাইনাল ইন্টারভিউয়ের জন্য বাছাই করা হয়। ফাইনাল ইন্টারভিউকে ক্যাম্পাস ইন্টারভিউ বলা হয়ে থাকে। এই ধাপে প্রার্থীকে ক্যাম্পাসে নিয়ে আসা হয় এবং তাকে পুরো দিনব্যাপি ইন্টারভিউ এবং নানা কার্যক্রমের মধ্যে দিয়ে নেয়া হয়।

ক্যাম্পাস ইন্টারভিউ

টেলিফোন ইন্টারভিউ শেষে তিনজন প্রার্থীকে বাছাই করা হয় যাদের ক্যাম্পাসে ইন্টারভিউয়ের জন্য নিয়ে আসা হয়। ক্যাম্পাসে আসা-যাওয়া, এবং থাকা-খাওয়ার খরচ সব ইউনিভার্সিটি বহন করে। প্রার্থীকে ইন্টারভিউয়ের আগের দিন বিকালে নিয়ে আসা হয় এবং ভালো মানের হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। প্রার্থীকে নিয়ে কমিটির দুই বা তিনজন সদস্য ডিনার করেন। মূলত তখন থেকেই ইন্টারভিউ শুরু হয়। আসলে ইন্টারভিউ না বলে পর্যবেক্ষণ বলা ভালো কারণ স্বাভাবিক কাজকর্ম, যেমন ডিনার করা, একসাথে বসে আলোচনা করা — এসবের মাধ্যমে প্রার্থীকে ভালো করে চেনা ও জানার সুযোগ হয়। সেই সাথে প্রার্থীর কোন প্রশ্ন থাকলে সেসব প্রশ্নের উত্তর দেয়ারও সুযোগ হয়।

ক্যাম্পাস ইন্টারভিউয়ের দিনটি কাটে কর্মব্যস্ততায়। এদিন প্রার্থীকে নানা জনের সাথে একাধিক মিটিং করতে হয়। দিনের শুরু হয় সকালের নাশতা দিয়ে। নিয়োগ কমিটির দুইজন সদস্য প্রার্থীকে পুর্ব নির্ধারিত রেস্তোরায় নিয়ে যান এবং সেখানে নাশতা করা হয় সেই সাথে হালকা পরিবেশে টুকটাক আলোচনা হয়। প্রার্থীকে ডিপার্টমেন্ট এবং ইউনিভার্সিটি সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়, ছাত্র-ছাত্রী এবং তাদের ব্যকগ্রাউন্ড সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়, ডিপার্টমেন্ট তার কাছ থেকে কী প্রত্যাশা করে সেসবও অল্পবিস্তর জানানো হয়। প্রত্যেকটি মিটিংই পূর্ব নির্ধারিত। নাশতা শেষ করে প্রার্থীকে নিয়ে ক্যাম্পাসে আসা হয়। ক্যাম্পাসে এসে প্রার্থী নিয়োগ কমিটির সদস্যদের সাথে ফর্মাল মিটিং করেন। অন্যান্য কর্মকান্ডের মধ্যে থাকে রিসার্চ প্রেজেন্টেশন, ক্লাস নেয়া, ডিপার্টমেন্টের প্রধানের সাধে মিটিং, ডিন-এর সাথে মিটিং, গ্রাজুয়েট ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে মিটিং, লাঞ্চ, ক্যাম্পাস ও শহর ঘুরে দেখা, এবং দিন শেষে হোটেলে ফিরে নেয়া।

নিয়োগ কমিটির সাথে ইন্টারভিউয়ের সময় সব সদস্যের কাছে একটি বিশাল প্রশ্নপত্র থাকে। যেখানে ১০-১২ টি প্রশ্ন থাকে যেগুলো একে একে প্রার্থীকে জিজ্ঞেস করা হয় এবং সদস্যরা নোট নিতে থাকেন। খুবই সাধারণ প্রশ্ন দিয়ে এই আলোচনা শুরুহয়, যেমন, “আপনি কেন এই পদের জন্য আগ্রহী হলেন?” এরপর ধীরে ধীরে বিজ্ঞাপনে যেসব যোগ্যতার উল্লেখ ছিল সে মোতাবেক একের পর এক প্রশ্ন করা হয় এবং সেগুলোর উত্তর নোট করা হয়। সবশেষে প্রার্থীর কোন প্রশ্ন আছে কিনা সেটা জিজ্ঞেস করা হয়। প্রশ্নগুলো এমন যে এর মাধ্যমে ধারণা করা যাবে একজন প্রার্থী এই পদের জন্য কতটা সুইটেবল। এখানে প্রার্থীর যোগ্যতা, কমিউনিকেশন স্কিল, টেম্পারমেন্ট, সিচুয়েশন হ্যান্ডল করার দক্ষতা, আগ্রহ, ব্যক্তিত্ব অ-নে-ক কিছু দেখা হয়। এক কথায় বলা যায় প্রার্থী কতটা সুইটেবল, কতটা ডিপার্টমেন্টের সবার সাথে একসাথে কাজ করতে পারবে, কোন পারসোনালিটির সমস্যা আছে কিনা–এরকম অনেক ননএকাডেমিক এবং বিহেভিওরাল জিনিস দেখা হয়। এই মিটিংটি সাধারণত এক ঘন্টার মতো হয়ে থাকে। মিটিংয়ে সবাই একটি করে প্রশ্ন করেন অথবা কমিটির প্রধানই সব প্রশ্ন করেন। তবে যে ভাবেই মিটিংটি পরিচালনা করা হোক না কেন সব প্রার্থীর জন্য সেটা একই ভাবে পরিচালিত হয়। একুইটি অফিসার এই মিটিংয়ে থাকেন তবে তিনি কোন প্রশ্ন করেন না। তিনি শুধু দেখেন প্রার্থীকে কমিটির সদস্যরা ফেয়ারলি ট্রিট করল কিনা।

ক্যাম্পাস ইন্টারভিউয়ের পরবর্তী ধাপে প্রার্থী তার রিসার্চ প্রেজেন্টেশন দেন। এটি রিসার্চ টক। প্রার্থী তার রিসার্চ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটিকেই উপস্থাপন করেন। এসময় কমিটির সদস্য, ছাত্র-ছাত্রী, অন্য ডিপার্টমেন্টের ফ্যাকাল্টি এবং আগ্রহী যে কেউই উপস্থিত থাকতে পারে। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে প্রার্থীকে কোনভাবেই হ্যারাস করা হয়না বা কেউ কোন উল্টাপাল্টা প্রশ্ন করে প্রার্থীকে হয়রানি করার চেষ্টাও করে না। এমনকি প্রার্থী নার্ভাস হয়ে যদি কোন উত্তর সঠিক নাও দেয় তাহলেও তাকে সবার সামনে নাস্তানাবুদ করার দূরতম কোন চেষ্টাও করা হয়না। এটা উল্লেখ করলাম একারণে যে আমি বাংলাদেশে একবার দেখেছিলাম কিভাবে একজন অতিথি গবেষককে সেমিনারে নাস্তানাবুদ করা হয়েছিল। সেটা চিন্তা করলেই আমার লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে আসে।

রিসার্চ টকের পর হয়তো লাঞ্চ করা হয় অথবা সময় থাকলে গ্রাজুয়েট ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে ওপেন মিটিং হয়। সেখানে ছাত্ররা এসে তার সাথে কথা বলে, তার রিসার্চ এরিয়া সম্পর্কে প্রশ্ন করে, প্রার্থী যদি শেষ পর্যন্ত নিয়োগ পান সেক্ষেত্রে তার সাথে রিসার্চ করার বিষয়েও অনেক সময় কথা বলে।

অনেক ইউনিভার্সটিতে প্রার্থীকে ক্লাস নিতে বলা হয়। সেটি ডামি ক্লাস হতে পারে যেখানে শুধু নিয়োগ কমিটির সদস্যরা ছাত্র হিসেবে উপস্থিত থাকেন। আবার প্রকৃত ক্লাসও হতে পারে। প্রার্থীকে কোন ধরনের ক্লাসে ক্লাস নিতে হবে সেটা আগে থেকেই জানিয়ে দেয়া হয় এবং অনেক সময় টপিকও বলে দেয়া হয়। প্রার্থীকে ২০-২৫ মিনিটের লেকচারের প্রস্ততি নিয়ে আসতে বলা হয়। আমি দুটি উইনিভার্সটিতে নিয়োগ পেয়েছিলাম। একটিতে রিসার্চ টক এবং দ্বিতীয় বর্ষের ক্লাসে পড়াতে হয়েছিল। আরেকটিতে কোন ডেমো ক্লাস নিতে হয়নি; শুধু রিসার্চ টক দিতে হয়েছিল। সাধারণত টিচিং এমফ্যাসিস থাকলে ডেমো ক্লাস নিতে দেয় আর রিসার্চ এমফ্যাসিস থাকলে বা আন্ডারগ্রাড লেভলে না পড়াতে হলে ডেমো ক্লাস নিতে হয়না। তবে লেকচারার পজিশনের ক্ষেত্রে টিচিং টক (ডেমো ক্লাস) দিতেই হয় কেননা লেকচারার পজিশনের মূল কাজই হলো পড়ানো।

এর পর থাকে ডিপার্টমেন্ট হেড/চেয়ার এবং ডিনের সাথে আলাদা আলাদা মিটিং। এই মিটিংগুলো গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় ডিপার্টমেন্টের হেড-এর উপর দায়িত্ব থাকে যোগ্য প্রার্থীকে নির্বাচন করার এবং জব অফার দেয়ার। অনেক সময় ডিন এই কাজ করেন। নিয়োগ কমিটি ক্যাম্পাস ইন্টারভিউয়ের পরে তিনজন প্রার্থীর ভালো দিক এবং দূর্বল দিকগুলোর একটা সারাংশ তৈরী করে সেটা ডিপার্টমেন্টের হেড অথবা ডিনের কাছে পাঠায়। ডিন সিদ্ধান্ত নেয় কাকে অফার দেয়া হবে। ডিন বা হেড এর সাথে প্রার্থীর মিটিংএ তারা অনেক সময় স্যালারির কথা জানায়। একাডেমিয়াতে (আমার জানা মনে) কখনোই জিজ্ঞেস করে না আপনি কত স্যালারি এক্সপেক্ট করেন। কোম্পানির জবের ক্ষেত্রে এটা কমন। একাডেমিয়াতে একটা নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো থাকে যেটা যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে অফার করা হয়। এই মিটিংয়ে প্রার্থীকে কোন সেমিস্টারে কতটি ক্লাস নিতে হবে বা কতটুকু রিসার্চ গ্রান্ট বাইরে থেকে আনতে হবে এসব নিয়ে আলোচনা হয়। উল্লেখ্য যে এ মিটিং কিন্তু স্যালারি বা সুযোগ-সুবিধা নিয়ে নেগোশিয়েশনের মিটিং নয়। নেগোশিয়েশন করতে হয় অফার দেয়ার পরে।

ফাইনাল অফার

ডিন কিংবা ডিন এবং হেড মিলে যোগ্য প্রার্থিকে বাছাই করেন। এরপর প্রথানুযায়ি ফোনে প্রার্থীর সাথে যোগাযোগ করা হয় এবং অফার দেয়া হয়। তখন স্যালারি এবং কী কী সুবিধা দেয়া হবে সেগুলো প্রার্থীকে জানানো হয়। প্রার্থীকে ৩ থেকে ৭ দিন সময় দেয়া হয় তার সিদ্ধান্ত জানাতে। এটি হল নেগোশিয়েশনের সময়। প্রার্থী স্যালারি আরেকটু বেশী চাইতে পারেন, স্টার্টআপ মানি বেশী চাইতে পারেন, ট্রাভেল মানি চাইতে পারেন, রিলোকেশন খরচ বেশী চাইতে পারেন, ইত্যাদি। অনেক সময় তারা যোগ্য প্রার্থীকে ধরার জন্য প্রার্থীর চাহিদা মোতাবেক অফার পরিবর্তন করেন। আবার অনেক সময় খুব বেশী পরিবর্তন/পরিবর্ধনের সুযোগ থাকেনা। সেক্ষেত্রে তারা সরাসরি বলে দেন যে আমরা এতটুকু বাড়াতে পারি। পুরা ব্যাপারটাই খুবই হৃদ্যতার সাথে সুন্দর ভাবে নেগোশিয়েট করা হয়। এখানে দরদামের মতো সেরকম কিছু করা হয়না।

প্রার্থী অনেক সময় অফার গ্রহণ করে না। সেক্ষেত্রে ডিন/হেড ইচ্ছে করলে দ্বিতীয় নির্বাচিত প্রার্থীকে অফার দিতে পারেন আবার নাও পারেন। এটা নির্ভর করে দ্বিতীয় প্রার্থী কতটা সুইটেবল/যোগ্য তার উপর। অনেক সময় এমন হয় যে পুরো নিয়োগ প্রকৃয়া শেষ করে কোন যোগ্য প্রার্থীই পাওয়া যায় না। সেক্ষেত্রে নতুন করে পুনরায় নিয়োগ প্রকৃয়া শুরু করতে হয়।

এ পর্ব এখানেই শেষ করছি। পরবর্তীতে শিক্ষক পদের আবেদনে কিভাবে নিজের সফলতার সম্ভাবনাকে বাড়ানো যায় এবং নিয়োগের পরে একজন নতুন শিক্ষককে কী কী প্রকৃয়া এবং ট্রেনিংএর মধ্যে দিয়ে যেতে হয় তা নিয়ে লেখার ইচ্ছা রাখছি।

Enayet

I am Enayet Raheem. I'm a full time statistician and part time thinker and I love the beauty of nature. Photography is my part time hobby. I work as a Data Scientist at a healthcare organization in the US.

Leave a Reply