গবেষণার ট্র্যাক রেকর্ড

স্পেশালটি এরিয়া ডেভলপ করা গবেষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অন্যতম ধাপ যা নতুনরা প্রায়ই বুঝতে পারে না

Photo by Lysander Yuen on Unsplash

নতুন গবেষকরা তাদের ক্যারিয়ারের শুরুতে একটি ব্যাপার পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারে না। সেটি হলো ট্র্যাক রেকর্ড। ট্র্যাক রেকর্ড বলতে বোঝায় record of performance — অর্থাৎ কর্মদক্ষতার প্রমাণ। গবেষণার ট্র্যাক রেকর্ড ও সেরকমই। রাতারাতি কোন একটি বিষয়ে প্রতিষ্ঠা অর্জন করা সম্ভব নয়। এর জন্য দীর্ঘ সময় ধরে (কমপক্ষে তিন থেকে পাঁচ বছর) নির্দিষ্ট একটি শাখায় সুনির্দিষ্ট টপিক বা সম্পর্কযুক্ত কতগুলো টপিকের উপর ক্রমবর্ধমান অবদান রাখা এবং ফলশ্রুতিতে গবেষণার সেই ক্ষেত্রটিতে পিয়ার রিভিউড (Peer reviewed) কাজের দ্বারা নিজেকে গবেষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব।

কোন একটি বিষয়ের উপর গবেষণা করতে গিয়ে সাইন্টিফিক লিটারেচার খুঁজলে দেখবেন সেই বিষয়ের উপর কিছু গবেষক আছেন যারা অথরিটি হিসেবে পরিচিত। তাঁরা এই বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছেন যার মধ্যে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে যেগুলো অগ্রণী গবেষণা (pioneering research) হিসেবে চিহ্নিত।

এই গবেষকগণ রাতারাতি এমন পরিচিতি লাভ করেননি। বরং বহু বছর ধরে সেই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে গবেষণায় সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে আজকের পর্যায়ে পৌঁছেছেন।

তরুণ গবেষকরা প্রায়ই তাদের গবেষণার লক্ষ্য কী হবে সেটি নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হয়। এর পিছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। তাদের অনভিজ্ঞতা একটি কারণ। তবে আমার মতে অন্যতম কারণ হলো গবেষণায় মেন্টরশীপ-এর অভাব। তারা সেরকম অনুসরণীয় গবেষকের সংস্পর্শে আসার সুযোগ পায় না। যে কারণে সহচর্যহীন পথে একা একা চলতে গিয়ে প্রায়ই লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারেনা। যারা একটু দূরদর্শী তারা কিছুটা সফল হয়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লক্ষ্যহীন ভাবে ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখতে গিয়ে তারা অনেক সময় ব্যয় করে ফেলে।

আর গবেষণা যেহেতু কোন না কোন ভাবে শিখতে হয় সেহেতু ভালো গবেষক-শিক্ষকের অভাবে অনেকের সম্ভাবনা বিকশিত হয় না।

কেন গবেষণা করবেন

অর্থাৎ গবেষণার ক্ষেত্রে গবেষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য আপনাকে প্রথমেই আপনার শেষ লক্ষ্য কী সেটি ভাবতে হবে। শুধু গবেষণার ক্ষেত্রে নয় জীবনের অন্য সকল ক্ষেত্রেও আমরা যখন কোন কাজ করি, সেটি করার পরে কী পেতে চাই সেটি লক্ষ্য রেখেই কাজ শুরু করি।

তেমনি গবেষণার ক্ষেত্রেও আপনি নিজেকে কোথায় প্রতিষ্ঠিত দেখতে চান সেটি নিয়ে ভাবতে হয়। এমনটি বলছি না যে আপনাকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করে এগোতে হবে। বরং একাধিক লক্ষ্য শুরুতে থাকতে পারে। তবে সময়ের সাথে নিজের ভালো লাগা না লাগা বিষয়গুলোকে আমলে নিয়ে একটি বা দুটি লক্ষ্যে কাজ করতে হয়।

অনেক সময় গবেষকরা তাদের কাজের ক্ষেত্র পরিবর্তন করে ফেলেন। ধরা যাক আজকে আপনি পাবলিক হেলথে বা মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক, কিংবা ক্যান্সার রোগের উপরে গবেষণা করছেন। এক বছর বা দুই বছর পরে আপনি এখান থেকে ডাইভার্ট করে অথবা ব্রাঞ্চ আউট করে অন্য একটি ক্রনিক ডিজিজ এর উপরে ও গবেষণার কাজ প্রসারিত করতে পারেন। এমনটি প্রায়ই হয়ে থাকে।

এরকম পরিবর্তন নানা কারণে হতে পারে যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল গবেষণায় ফান্ড অ্যাভেইলেবল কিনা এবং কোলাবোরেশন কাদের সাথে আপনি সংস্থাপন করতে পারছেন তার উপরেও অনেকটা নির্ভর করে। আপনি কোথায় বসে গবেষণা করছেন সেটিও অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গবেষণার জন্য পরিবেশ, সুযোগ সুবিধা, ড্যাটার লভ্যতা, সর্বোপরি স্পনসরশীপ অর্থাৎ ইনস্টিটিউশনাল সাপোর্ট অনেক সময় গবেষণার ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করে।

গবেষক হওয়ার পূর্ব প্রস্তুতি

গবেষক হওয়ার জন্য কি উচ্চ শিক্ষিত হওয়া প্রয়োজন কিনা সেটি নিয়ে ইদানিং অনেকেই অনেক রকম কথা বলে থাকেন।

গবেষণা করার জন্য অবশ্যই কোন একটি বিষয়ের প্রতি জানাশোনা থাকা দরকার। কেননা গবেষণার উদ্দেশ্য প্রধানত দুটি।

প্রথমত নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা অর্থাৎ এ যাবৎ যা জানা হয়েছে তার চেয়ে নতুন কিছু জানার সুযোগ তৈরি করা এবং নতুন কোন তথ্য প্রকাশ করা। কিংবা কোন জানা জ্ঞানকে সংশোধিত করা কিংবা ভুল প্রমাণিত করা।

অর্থাৎ নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করার জন্য আপনাকে প্রথমে জানতে হবে কতটুকু ইতোমধ্যে জানা হয়েছে। সেই জ্ঞানের আলোকে হবে নতুন জ্ঞান সৃষ্টির প্রণোদনা। তাহলে দেখা যাচ্ছে কোনো একটি বিষয়ে নতুন জ্ঞান সৃষ্টির জন্য সেই বিষয়ের প্রতি ভালো রকম জানা শোনা দরকার আছে। সেই জানাশোনা কি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে অর্জন করতে হবে? সহজভাবে উত্তর দিলে উত্তর হবে হ্যাঁ। তবে ব্যতিক্রম অবশ্যই থাকতে পারে।

দ্বিতীয়ত গবেষণার উদ্দেশ্য হল বাস্তবধর্মী কোন সমস্যার সমাধান করা। অর্থাৎ আপনি কোন একটি সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন এবং সেই সমস্যাটি কিভাবে সমাধান করবেন তার জন্য হলেও গবেষণা হতে পারে। এখানে সমস্যা বলতে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের মানব সৃষ্ট কোন সমস্যা — এমনটি হতেও আবার নাও হতে পারে।

মানুষের জীবনের মান উন্নয়ন, চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতি, স্বাস্থ্য সেবার উন্নয়ন ইত্যাদি সমস্যা সমাধানের জন্য গবেষণার মাধ্যমে নতুন পথ ও নতুন উপায় খুঁজে বের করা যেতে পারে।

এক্ষেত্রেও বিষয়টি সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকলে সমস্যা ধরতে পারা গেলেও সেই সমস্যাটি কিভাবে সাসটেইনেবল উপায়ে সমাধান করা যাবে সেটি বের করা সম্ভব নাও হতে পারে। হঠাৎ সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং সেই সমস্যা সমাধানের পথ বাতলে দেয়ার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।

গবেষণায় পা বাড়ানো

এর আগের লেখায় আলোচনা করেছিলাম গবেষণার এথিক্যাল ব্যাপার নিয়ে। সেখানে উল্লেখ করেছিলাম গবেষণা করার জন্য এথিক্যাল কিছু নিয়ম-রীতি রয়েছে। এরকম নিয়ম জানার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। কারণ এগুলো যে কেউই অনলাইনে প্রাপ্ত রিসোর্স থেকে পড়ে জেনে নিতে পারেন। ‌

কিন্তু গবেষণা পদ্ধতিগুলো সঠিক ভাবে রপ্ত করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। শুধু বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের জন্যই নয়, গবেষণা করার জন্য সুনির্দিষ্ট কারিকুলাম অনুসরণ করে ইউনিভার্সিটিগুলোতে নানা কোর্স অফার করা হয়। এই ধরনের কোর্স গবেষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পথে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। ‌

তবে কোর্স করার মধ্যে গবেষণা করার জ্ঞান অর্জন সীমিত রাখলে হবে না। কারণ হলো গবেষণা একটি ব্যবহারিক বিষয়। ‌ পাঠ্যসূচিতে লিপিবদ্ধ জ্ঞান কোর্সওয়ার্কের মাধ্যমে অর্জন করলেও ব্যবহারিক জ্ঞানের প্রসার ও সমৃদ্ধি ও প্রকৃত ভাবে অনুধাবন করার জন্য বাস্তব কোন প্রজেক্টের সাথে জড়িত হতে হয়। সেজন্যেই ইন্টার্নশীপ নামে একটি বিষয় কারিকুলামের সাথে অন্তর্ভুক্ত থাকে। যেখানে শিক্ষার্থীরা তথ্য জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি ব্যবহারিক জ্ঞান বিশেষ করে ইন্ডাস্ট্রিতে বাস্তব জীবনে অর্জিত জ্ঞান কীভাবে ব্যবহার করা হবে সে সম্পর্কে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

উপরিউক্ত বর্ণনার আলোকে এইটুকু বলতে পারি তরুণ শিক্ষার্থীরা নিজেদেরকে গবেষক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে কোন একটি বিষয় সম্পর্কে আগ্রহ সৃষ্টি করতে হবে। সেরকম আগ্রহ শুধু ইচ্ছে করলেই সৃষ্টি হয় না বরং একাডেমিক কোরস। করার সময় কোন একটি বিশেষ বিষয়বস্তু সম্পর্কে আগ্রহ জন্মাতে পারে। কিংবা পাঠ্যবইয়ের বাহিরের কোন একটি বিষয়ের প্রতিও কারো আগ্রহ জন্মাতে পারে। ‌ সে ক্ষেত্রে সেই বিষয়ের তথ্য জ্ঞান নিজে পড়াশোনা করে অর্জন করা যেতে পারে। ‌এভাবে নিজেকে তথ্য জ্ঞানে প্রাথমিকভাবে সমৃদ্ধ করার পর সেই বিষয়ের একজন গবেষকের সাথে ইন্টার্নশিপ করে গবেষণায় হাতে খড়ি হতে পারে।

নিজেকে গবেষণার জন্য প্রস্তুত করা

  • যে বিষয় সম্পর্কে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে এবং যে বিষয়টি নিয়ে গবেষণার করার ইচ্ছা জেগেছে সেই বিষয় সম্পর্কে তত্ত্বীয় জ্ঞান অর্জন করা ভালো হবে। তত্ত্বীয় জ্ঞান বলতে বিষয়টি সম্পর্কে ভালোমতো ধারণা নিতে হবে।

  • সেই বিষয়ে উল্লেখযোগ্য এবং সুপরিচিত জার্নাল গুলোতে প্রকাশিত গবেষণা পত্রগুলোর শিরোনাম এবং অ্যাবস্ট্রাক্ট বা সারাংশ গুলো পড়তে হবে। এটি নিয়মিত করার অভ্যাস করতে হবে এবং পড়ার সাথে সাথে নোট লিখে রাখার চর্চা করতে হবে।

  • কোন আর্টিকেল বা স্পেসিফিক কোন টপিক পছন্দ হলে সেই গবেষণাপত্রটি ডাউনলোড করে বিস্তারিত পড়ে নেয়া যেতে পারে। ‌এরপর সেই আর্টিকেলটি যদি পুরোটা পড়ার পরে ভালো লাগে তাহলে একটি সারাংশ তৈরি করতে হবে যেখানে কোন জিনিস গুলো ভালো লেগেছে এবং কোন জিনিস গুলোকে আগ্রহোদ্দীপক মনে হয়েছে আর কোন জিনিসগুলো ত্রুটিপূর্ণ মনে হয়েছে তা লিপিবদ্ধ করা যেতে পারে।

  • সেই সাথে আর্টিকেলটি পড়ার পরে এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিচারে এনে এবং এর সম্ভাব্য ত্রুটিগুলো আমলে নিয়ে এই গবেষণাটি থেকে আর নতুন কী কী করা যেতে পারে সে সম্পর্কে নিজের আইডিয়াগুলোকে সংক্ষেপে লিখে ফেলতে হবে। ‌ যেগুলো পরবর্তীতে আপনার মেন্টর বা সিনিয়র গবেষক এর সাথে আলোচনা করার সময় কাজে দেবে।

  • এভাবে বেশ কিছুদিন পড়ার পর আপনার নিজের মাঝে নতুন আইডিয়ার জন্ম নিতে পারে। ‌ সেই আইডিয়া গুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে তার একটি আউটলাইন আপনি তৈরি করতে পারেন। ‌ কীভাবে আউটলাইন তৈরি করবেন সে জন্য বিখ্যাত গবেষকদের গবেষণা পত্রের আউট লাইন অনুসরণ করতে পারেন। ‌

  • এরপর সিনিয়র গবেষক বা আপনার মেন্টর এর সাথে এই ব্যাপারটি নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে সে সম্পর্কে মতামত নিবেন ও পরামর্শ করবেন।

  • সিনিয়র গবেষকের তত্ত্বাবধানে গবেষণাপত্রটি সম্পন্ন করার জন্য আর কী কী দরকার সে ধাপগুলো সম্পন্ন করে গবেষণার কাজটি শুরু করবেন। গবেষণা শেষ হলে সে গবেষণার কাজগুলোকে সেকশন আকারে সাজিয়ে ম্যানুস্ক্রিপ্ট তৈরী করবেন।

  • প্রথম ড্রাফ্ট তৈরি হলে নিজে আরও কয়েকবার পড়ে সংশোধন ও পরিবর্ধন করে তারপর সিনিয়র রিসার্চার বা মেন্টর এর কাছে পাঠাতে পারেন তার মতামতের জন্য।

শেষ কথা

গবেষণা একটি ধাপে ধাপে সম্পন্ন করার মত সিস্টেমেটিক কাজ। হুট করে গবেষক হওয়া যায় না। এজন্য প্রয়োজন অধ্যবসায় পরিশ্রম এবং লেগে থাকার মানসিকতা। ‌ভালো গবেষককে শিক্ষক হিসেবে পেলে ছাত্র-ছাত্রীরা অনুপ্রাণিত হয়। ভালো গবেষকদের সাথে কাজ করে আস্তে আস্তে কাজ শিখে নেয়া যায়। এভাবে একজন নবীন শিক্ষার্থী সময়ের সাথে গবেষণার ক্ষেত্রে তার নিজের অবদানকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। ফলশ্রুতিতে জন্ম নেয় একজন নতুন গবেষক যিনি কাজের মাধ্যমে নিজেকে সেই বিষয়টিতে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

লাইক ও শেয়ার করুন

এই লেখাটি ভাল লাগলে কিংবা দরকারি মনে হলে লাইক ও শেয়ার করতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ।

Avatar
Enayetur Raheem
Senior Data Scientist/Statistician

I am currently working in a health service company in the USA. The best way to get a response from me is to leave a comment down below. For career advice, please use email. Opinion expressed here are my own.

comments powered by Disqus
Next
Previous

Related